স্বামীজীর ভাবনায় নীলাম্বরের বাগানবাড়ি

গঙ্গার দুই তীরে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের দুই পবিত্র আশ্রম: অজানা ইতিহাস, স্মৃতি ও আধ্যাত্মিক আলো

কলকাতা মহানগরী যেন গঙ্গার দুই তীরে আদি ও আধুনিক ভারতের সংলগ্ন এক সেতুবন্ধন। এই দুই তীরেই ছড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু স্থান, যা কেবল ইতিহাসের পাতায় নয় — মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে পরম শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে। গঙ্গার পূর্ব তীরে কাশীপুর উদ্যানবাটী, আর পশ্চিম তীরে নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়ি — যা পরবর্তীতে পরিচিত হয় ‘পুরনো মঠ’ নামে। এই দুটি স্থান শুধু শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের স্মৃতিবিজড়িত নয়, বরং সমগ্র রামকৃষ্ণ আন্দোলনের প্রথম যুগের শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবেও পরিগণিত।

কাশীপুর উদ্যানবাটী: এক জীবনের অন্তিম অধ্যায়

১৮৮৫ সালের ১১ ডিসেম্বর, শ্রীরামকৃষ্ণ গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় স্থানান্তরিত হন কাশীপুর উদ্যানবাটীতে। এরপর প্রায় আট মাস, অর্থাৎ ২৪৮ দিন, তিনি এই বাগানবাড়িতে অবস্থান করেন — যা আজ একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। তাঁর সেবায় নিয়োজিত ছিলেন ভবিষ্যতের স্বামী বিবেকানন্দ সহ অন্যান্য তরুণ ভক্তরা। এখানেই দিনরাত্রি ঠাকুরের শরীর ও মনোভাব পর্যবেক্ষণ করতে করতে তাঁরা নিজেদের জীবনের পথ খুঁজে পান — ত্যাগ ও সেবার মাধ্যমে মানবমুক্তির আদর্শ।

এই সময়ে ঠাকুরের দেহান্তকালীন ভক্তিসাধনা যেন ভবিষ্যতের রামকৃষ্ণ আন্দোলনের জন্য আত্মিক ভিত্তি রচনা করে। উদ্যানবাটির বাগানে তাঁর পদচিহ্ন, ভক্তদের সান্নিধ্য, ও সেই নিঃশব্দ করুণাত্মক সন্ধ্যার প্রতিটি স্মৃতি আজও গঙ্গার বাতাসে মিশে গিয়েছে।

পশ্চিম তীরের বাগানবাড়ি: এক আধ্যাত্মিক আন্দোলনের সূতিকাগার

গঙ্গার পশ্চিম তীরে অবস্থিত নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়িটি তখন এক নিভৃত, নির্জন স্থান। এই বাড়িরই এক অংশে ১৮৮৮ সালে মা সারদাকে প্রথমবারের মতো কলকাতায় আনা হয়। কামারপুকুরে নিঃসঙ্গ ও আর্থিক কষ্টের মধ্যে থাকা মায়ের কাছে এটি ছিল এক নতুন আশ্রয় — যেখানে তিনি তাঁর প্রথম নগরজীবনের আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন।

মা সারদা: বৈরাগ্যের প্রতিমূর্তি

মা সারদা এই বাগানবাড়িতে প্রায় দেড় বছর কাটিয়েছিলেন। এখানে অবস্থানকালে তাঁর বহু গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। একদিন তিনি ছাদে ধ্যানের সময় ‘নির্বিকল্প সমাধি’ লাভ করেন — শরীরবোধ হারিয়ে তিনি এক পরম চেতনার সঙ্গে যুক্ত হন। এই অবস্থার কথা তিনি পরে বলেছিলেন, “আমি অনুভব করলাম, আমি কেউ নই, শুধু চেতনা।”

১৮৯৩ সালে এখানেই তিনি ‘পঞ্চতপা ব্রত’ পালন করেন — এই ব্রতের মধ্যে চারদিকে আগুন জ্বেলে এবং মাথার ওপর সূর্যের তাপ সহ্য করে তিনি উপবাসসহ ধ্যান করেন। তাঁর শরীর ঝলসে গিয়েছিল, কিন্তু সেই ব্রতের ফলে এক অগ্নিপরীক্ষা পার হয়ে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তিকে আরেক স্তরে উন্নীত করেন।

গেরুয়াবস্ত্র পরিহিতা কিশোরী: এক নিঃশব্দ তপস্বিনী

এই সময়েই প্রতিদিন সকালে একটি কিশোরী এই বাড়ির ছাদে এসে বসত। তার পরনে গেরুয়া বস্ত্র, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা — কেউ তাকে চিনত না, সে কথা বলত না, কেবল নীরবে বসে থাকত। মা একদিন তাকে দেখে বলেছিলেন, “এই মেয়েটি যেন আমার বৈরাগ্যের প্রতিচ্ছবি।”

বহু বছর পরে, ১৯২১ সালে, এই বাড়ির এক সন্ন্যাসিনী স্বীকার করেন, “আমি সেই কিশোরী। মা আমাকে তখনই বলেছিলেন, ‘তুই মঠের জন্য তপস্যা করবি।’” এই কথাগুলি কেবল ইতিহাস নয় — যেন এক আধ্যাত্মিক ভবিষ্যদ্বাণী।

স্বামী বিবেকানন্দের প্রত্যাবর্তন ও পুরনো মঠ

১৮৯৭ সালের ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পে আলমবাজার মঠ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, মঠের কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয় এই নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়িতে। এই বাড়িতে বসেই স্বামীজি ভবিষ্যৎ বেলুড় মঠের নীতিমালা নির্ধারণ করেন। এখানেই ‘খণ্ডন ভববন্ধন’ রচনা করেন — এক ধ্বংসের মধ্য থেকে মুক্তির আহ্বান।

ভগিনী নিবেদিতার দীক্ষা ও স্বামীজির বাণী

১৮৯৮ সালের ২৫ মার্চ, এখানেই ভগিনী নিবেদিতাকে দীক্ষা দেন তিনি। একটি ছোট বাগানের এক কোণায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, “যাও, বুদ্ধের মতো আত্মত্যাগ করো।”

এই বাগানবাড়ি তখন রামকৃষ্ণ আন্দোলনের মস্তিষ্ক এবং হৃদয় হয়ে উঠেছিল — যেখানে শিক্ষা, সেবা, ত্যাগ, ও ভক্তির মিলনে এক নতুন পথের সূচনা হয়।

শ্রীমায়ের ঘাট ও স্বপ্নবাণী

এই বাড়ির ঘাটে একদিন মা সারদা এক অলৌকিক স্বপ্ন দেখেন — তিনি দেখেন, ঠাকুর গঙ্গায় বিলীন হয়ে যাচ্ছেন, আর বিবেকানন্দ সেই জলে স্নান করে মানুষের উপর জল ছিটিয়ে তাদের মুক্ত করছেন। এই স্বপ্ন যেন সেই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা — ঠাকুরের চেতনা নদীর মতো প্রবাহিত, আর স্বামীজি সেই চেতনার ধারাকে সমাজের প্রতি নিবেদিত করছেন।

এই ঘাট আজ ‘শ্রীমায়ের ঘাট’ নামে পরিচিত। এটি একটি জাতীয় স্মারক — যেখানে প্রতি বছর হাজারো ভক্ত এসে মাথা নত করেন।

একটি তপস্যার কেন্দ্র থেকে এক বিশ্বআন্দোলন

স্বামী বিবেকানন্দ এখানেই বলেছিলেন, “আমাদের মঠ হবে গঙ্গার তীরে — এই তপস্যার জায়গা থেকে।” এই কথাটিই আজ সত্য হয়ে উঠেছে বেলুড় মঠের আকারে। কিন্তু এই পুরনো মঠ — নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের সেই বাগানবাড়ি — রয়ে গেছে এক জীবন্ত স্মৃতির মতো, যা শুধুই ইতিহাস নয়, এক চলমান চেতনা।

উপসংহার: আধ্যাত্মিক আগুনের স্পর্শ

এই বাড়ি, এই ঘাট, এই ছাদ, এই ধ্যান — সবই যেন আধ্যাত্মিক আগুনের ছোঁয়ায় জীবন্ত। এখানে কেবল ঠাকুরের স্মৃতি নয়, রয়েছে এক বৃহত্তর আধ্যাত্মিক আন্দোলনের সূচনা। এখানে এক মা বৈরাগ্যের মধ্যে নারী-সন্ন্যাসের প্রণব রূপরেখা এঁকেছেন, এক কিশোরী নিঃশব্দে ভবিষ্যতের সাধ্বী হয়ে উঠেছেন, এক সন্ন্যাসী বিশ্বকে আলোকিত করার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন।

এই দুটি আশ্রম আজও গঙ্গার দুই তীরে দাঁড়িয়ে রয়েছে — এক তীর স্মৃতির, এক তীর ভবিষ্যতের। তাদের মাঝে প্রবাহিত ঠাকুরের চেতনা, যা আজও মানুষের মনে আলো জ্বালায়।

KALCHAKRA

Discover the unseen world of our city. As researchers in Archeology, Anthropology, Ancient History, and Prehistory, we invite you to explore its hidden treasures. Uncover the small, overlooked stories of its people and the lost time that lies beneath its streets. Through our eyes, recognize the unknown history of this familiar landscape. Join us in unearthing layers of human experience that have shaped this city. From Prehistory to Ancient History, artifacts to cultural narratives, our research reveals a rich tapestry of discovery. Rediscover the essence of this city and uncover hidden chapters of our shared human heritage.

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম